কলকাতা ও শহরতলির সরকারি হাসপাতালে জরুরি রোগীর জন্য বেড না থাকলে এবার নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ মিলতে পারে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে এবং প্রযোজ্য সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসার খরচ বহন করার ব্যবস্থা থাকবে।
নতুন ব্যবস্থায় কলকাতা ও শহরতলির ছ’টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজকে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে রোগী বা তাঁর পরিবারের সদস্যকে নিজের উদ্যোগে কোনও বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হতে হবে না। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য দফতরের সমন্বয়ের মাধ্যমেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে।
কোন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের রোগী কোন বেসরকারি হাসপাতালে যাবেন?
নতুন ব্যবস্থায় ছ’টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালকে যুক্ত করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তালিকাটি হল:
| সরকারি মেডিক্যাল কলেজ | যুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল |
|---|---|
| এসএসকেএম হাসপাতাল | কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ, যাদবপুর |
| কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ | মণিপাল হাসপাতাল, ঢাকুরিয়া |
| কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ | মণিপাল হাসপাতাল, সল্টলেক |
| আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ | আইএলএস হাসপাতাল, সল্টলেক |
| সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ | জেনিথ হাসপাতাল, বেলঘরিয়া |
| এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ | অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল |
তবে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্তিকরণের প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে সেখানে এই ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই পুরোপুরি চালু হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সরকারি হাসপাতালে বেড না থাকলে কী হবে?
কোনও রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগে এলে প্রথমে সেখানেই তাঁর চিকিৎসা শুরু হবে। চিকিৎসকেরা রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করবেন।
এর পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য যদি হাসপাতালে পর্যাপ্ত বেড না থাকে, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য দফতরের Integrated Control Room-এর সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
রোগীর শারীরিক অবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং কোন ধরনের বেড দরকার – এই সমস্ত তথ্য নিয়ন্ত্রণকক্ষে পাঠানো হবে। এরপর নিয়ন্ত্রণকক্ষ সংশ্লিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেডের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে।
বেড পাওয়া গেলে সরকারি হাসপাতাল থেকেই রোগীকে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।
পরিবারের সদস্যরা কি নিজেরাই বেসরকারি হাসপাতালে যেতে পারবেন?
না। এই সুবিধা পাওয়ার জন্য রোগী বা তাঁর পরিবারের সদস্যকে নিজের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হওয়ার কথা নয়।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের রেফারাল এবং স্বাস্থ্য দফতরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমেই রোগীকে স্থানান্তর করা হবে।
অর্থাৎ, সরকারি হাসপাতালে বেড না থাকলেই সরাসরি কোনও বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসার দাবি করা যাবে না।
রোগীকে কী ভাবে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে?
রোগীর জন্য বেড নিশ্চিত হওয়ার পর সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সের মাধ্যমে তাঁকে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করার ব্যবস্থা করা হবে।
এই ব্যবস্থায় রোগীর পরিবারের কাছ থেকে অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া নেওয়ার কথা নয়। তবে বাস্তবে কোন পরিস্থিতিতে এবং কী নিয়মে এই পরিবহণ পরিষেবা দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করবে।
চিকিৎসার খরচ কে দেবে?
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল চিকিৎসার খরচ মেটানোর সরকারি স্বাস্থ্য কভারেজ।
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসাথী, আয়ুষ্মান ভারত বা মুখ্যমন্ত্রীর স্বাস্থ্য প্রকল্পের মতো সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসার খরচ মেটানোর ব্যবস্থা করা হবে।
এর মূল উদ্দেশ্য হল সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় বেড না থাকার কারণে কোনও জরুরি রোগী যাতে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন এবং পরিবারের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়ে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সব রোগী, সব ধরনের চিকিৎসা বা প্রতিটি পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত – এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়। রোগীর চিকিৎসার ধরন, যোগ্যতা এবং কোন সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প প্রযোজ্য, তার উপর খরচ মেটানোর নিয়ম নির্ভর করতে পারে।
কেন এই ব্যবস্থা চালু করা হল?
কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলির জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ অনেক সময় বেশি থাকে। কোনও গুরুতর রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় বেড না পাওয়া গেলে পরিবারকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হয়।
বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে এই ধরনের দেরি রোগীর চিকিৎসায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি এড়াতেই সরকারি হাসপাতাল এবং নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সমন্বিত রেফারাল ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লক্ষ্য হল, সরকারি হাসপাতালে বেড না থাকলেও উপযুক্ত রোগী যাতে দ্রুত বিকল্প চিকিৎসা পরিষেবা পান।
নতুন ব্যবস্থা নিয়ে কী কী প্রশ্ন রয়েছে?
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আগে থেকেই রোগীর চাপ থাকলে সরকারি হাসপাতাল থেকে আসা নতুন রোগীর জন্য সঙ্গে সঙ্গে বেড দেওয়া সবসময় সহজ নাও হতে পারে।
এছাড়া চিকিৎসার খরচের দায়, বেডের প্রকৃত প্রাপ্যতা এবং রাতের জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী স্থানান্তরের নিয়ম নিয়েও আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারি হাসপাতাল, Integrated Control Room এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে দ্রুত সমন্বয়ের উপর।
মনে রাখবেন
সরকারি হাসপাতালে বেড না থাকলেই রোগী নিজে থেকে তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন – এমন নয়।
প্রথমে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা ও মূল্যায়ন হবে। প্রয়োজন হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য দফতরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। বেড নিশ্চিত হওয়ার পর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে।
তাই জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের নিজের উদ্যোগে একাধিক হাসপাতালে ঘোরার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
সরকারি হাসপাতালে বেডের অভাবে জরুরি রোগীদের চিকিৎসা পেতে সমস্যার মুখে পড়তে না হয়, সেই লক্ষ্যেই কলকাতা ও শহরতলির কয়েকটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বয় করা হয়েছে।
তবে এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের রেফারাল, বেডের প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্য দফতরের অনুমোদন এবং প্রযোজ্য সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনও রোগী এই ব্যবস্থার আওতায় পড়ছেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি হাসপাতাল থেকেই নিশ্চিত করা উচিত।